ইসলামী আন্দোলনে ত্যাগ ও কুরবানী -মাওলানা শরীফ হুসাইন

ইসলামের জন্য ইসলাম সম্মত উপায়ে যে আন্দোলন পরিচালিত হয় তাকেই বলা হয় ইসলামী আন্দোলন। একটি সত্যিকার ও স্বার্থক ইসলামী আন্দোলনের জন্য উক্ত দু’টি বিষয় আবশ্যিকভাবে নিশ্চিত করতে হয়। আন্দোলনের ছোট-বড় সকল কর্মসূচি গ্রহণে ও বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়ে উক্ত বৈশিষ্ট্য দু’টি শতভাগ থাকতে হয়। পদ, ক্ষমতা, সুখ্যাতি, অর্থ ইত্যাদির অভিলাষে ইসলামের নামে বা ইসলাম সম্মত উপায়ে আন্দোলন পরিচালিত হলে তা ইসলামী আন্দোলন নয়। আবার আল্লাহকে খুশি করার জন্য, ইসলাম প্রতিষ্ঠিত করার স্বার্থে যদি এমন কিছু করা হয় যা ইসলাম অনুমোদন করে না তবে এ ধরণের প্রয়াস ও চেষ্টাকেও ইসলামী আন্দোলন বলা যাবে না। আরো সহজভাবে কথাটা এভাবে বলা যায় যে, ইসলামী আন্দোলনের স্বার্থে কেউ যদি নিজেই ইসলামের বাইরে চলে যায় তবে তার কাজকে ইসলামী আন্দোলন নামে অভিহিত করার কোন সুযোগ নেই।

পৃথিবীর ইতিহাসে ইসলামী আন্দোলনের পথ কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। আল্লাহ সরাসরি যে সকল মহামানবকে ইসলামের কাজের জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন সে সকল নবী-রাসুলগণও ইসলামের জন্য কাজ করতে গিয়ে শত্রুদের জুলুম-নির্যাতনের নির্মম শিকার হয়েছেন। শতভাগ নিষ্পাপ ও নির্মোহ এ মানুষগুলোকেও দৈহিক নির্যাতন করা হয়েছে, সামাজিকভাবে হেয় করা হয়েছে। তাদের অনেককেই জানে মেরে ফেলা হয়েছে। ইসলামের জন্য নবীদের ত্যাগ ও কুরবানীর অসংখ্যা দৃষ্টান্ত মহাগ্রন্থ কুরআনে রয়েছে।

ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের ত্যাগ ও কুরবানীর আদর্শে উজ্জীবিত করার জন্য সবচেয়ে ফলপ্রসু ও সহজ গ্রন্থের নাম কুরআনে কারীম। এর পাতায় পাতায়, সুরায় সুরায় রয়েছে ত্যাগ ও কুরবানীর অনুপম দৃষ্টান্ত, মন নাড়া দেয়া অনুপ্রেরণা, প্রজ্ঞাপূর্ণ নির্দেশ, আদরমাখা ভীতি এবং কাঙ্খিত পুরস্কারের হৃদয়গ্রাহী সাবলীল সহজবোধ্য আলোচনা।

পৃথিবীতে যত বার যত পরিবর্তন ঘটেছে তা সবই কিছু মানুষের ত্যাগ ও বিসর্জনের বিনিময়েই ঘটেছে। কমিউনিজম, ডেমোক্রেসি, সেকুলারিজম যা-ই বলেন না কেন এসব প্রতিষ্ঠার পেছনে অগণিত মানুষের স্বত:স্ফূর্ত ঘাম, রক্ত, অর্থ ও সময়ের বিসর্জন আছে। এক সময়ের ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে আসার জন্য পৃথিবীর মানুষকে ত্যাগ ও বিসর্জনের পথ মাড়িয়ে আসতে হয়েছে।

মায়ানমারে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য কয়েক দশক ধরে কিছু মানুষ সকল ধরণের জুলুম, নির্যাতন সয়ে ত্যাগ ও বিসর্জনের দৃষ্টান্ত পেশ করেছে তা অবাক হওয়ার মতো। যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক নিপীড়ন ও বৈষম্য থেকে মুক্তি লাভের আশায় বেশ কিছু রাজ্যের দেশপ্রেমী মানুষ দশকের পর দশক রাজনৈতিক আন্দোলন করে যাচ্ছে, গেরিলা যুদ্ধ করে যাচ্ছে। যাদের অনেক ত্যাগ ও বিসর্জনের খবর পূঁজিবাদ নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া কভারেজ করে না।

তাদের ত্যাগ আর ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের ত্যাগের মধ্যে বিরাট একটি ফরক আছে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, “তোমরা দু:খ পেয়েছ! তারাও তো তোমাদের মতোই দু:খ পেয়েছিল। কিন্তু তোমরা (দু:খের বিনিময়ে) আল্লাহর কাছে এমন কিছু আশা কর যা তারা করে না। আল্লাহ তাআলা জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অধিকারী।” সুরা নিসা:১০৪

ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের জন্য, নিজেদের বানানো মতবাদের জন্য, নিজেদের ক্ষমতায়নের জন্য যারা ত্যাগ ও বিসর্জনের প্রমাণ পেশ করছে তারা পরকালে এর জন্য কিছুই পাবে না। কিন্তু ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের লাভ ও সফলতা এখানেই। ইসলামী আন্দোলন করতে যেয়ে তারাও আন্দোলনের স্বার্থে, ইসলামের স্বার্থে জীবনের অনেক সুখ ও স্বপ্নকে ত্যাগ করে, স্বেচ্ছায় অনেক কিছুকে বিসর্জন দেয় আবার জুলুম নির্যাতন সইতে থাকে। এদের এ সকল ত্যাগ মূল্যহীন নয়, বিনিময় হীন নয়। ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের বিসর্জন দেয়া ঘামের প্রতিটি ফোঁটা, রক্তের প্রতিটি ফোঁটা, সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান। মহান আল্লাহ এগুলোর মূল্য পরিশোধ করবেন জান্নাত দিয়ে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, “নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের জান ও মাল জান্নাতের বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়েছেন।” সুরা তাওবা:১১১

পেশা গ্রহণ না করলে যেভাবে আল্লাহ কারো অভাব দূর করেন না। অনুরূপভাবে আন্দোলনে না নামলে সমাজিক জুলুম, বৈষম্য ও মানুষের ওপর মানুষের প্রভূত্ব দূর হবে না। এ পৃথিবীতে পরিবর্তন ঘটাতে চাইলে কাজ করতে হবে। কাজ করতে গেলে ত্যাগ ও কুরবানীর নজরানা পেশ করতে হবে। নানামুখী জুলুম ও নির্যাতন সইতে হবে। এটাই পৃথিবীর চির বাস্তবতা। এটাই আল্লাহর সুন্নাহ। যারা যে ধরণের পরিবর্তনের জন্য ত্যাগ করবে, বিসর্জন করবে আল্লাহ তাদের জন্য সে ধরণের পরিবর্তন পৃথিবীতে ঘটাবেন। ইসলামের জন্য ইসলামসম্মত উপায়ে মানুষ যখন আন্দোলন করবে, ত্যাগ ও কুরবানীর সর্বোচ্চ নযরানা পেশ করবে একমাত্র তখন আল্লাহ ইসলামের পক্ষে পরিবর্তন ঘটাবেন। তবে ইসলামী আন্দোলন ও দুনিয়াবী আন্দোলনের মাঝে একটি বড় ফরক হল দুনিয়াবী আন্দোলন সফল ও বিজয়ী হওয়ার জন্য কর্মীদের ত্যাগ ও বিসর্জনের পাশাপাশি জাগতিক শক্তিতে বলীয়ান হতে হয়। কিন্তু বিপরীতে ইসলামী আন্দোলন সফল ও বিজয়ী হওয়ার জন্য কর্মীদের ত্যাগ ও কুরবানীর পাশাপাশি রূহানী শক্তিতে বলীয়ান হতে হয়। কর্মীবাহিনী যতক্ষণ পর্যন্ত রূহানী শক্তিতে বলীয়ান না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত শুধু ত্যাগ ও কুরবানী দিয়ে আর জাগতিক শক্তির মহড়া দিয়ে কোন ইসলামী আন্দোলন বিজয়ী হবে না।

আবার রূহানী শক্তি নিয়ে বসে থাকলে হবে না। নববী তরিকায় কাজে নামতে হবে। কাজের স্বার্থে, আন্দোলনের স্বার্থে, ইসলামের স্বার্থে জীবন, যৌবন, সুখ, স্বপ্ন বিসর্জন দিতে হবে।
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, “তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, যদিও এখনও তোমাদের নিকট তোমাদের পূর্ববর্তীদের অবস্থা আসে নাই? অর্থ-সংকট ও দু:খ-ক্লেশ তাদের স্পর্শ করেছিল  এবং তারা ভীত ও কম্পিত হয়েছিল। এমন কি রাসুল ও তার সাথে ঈমান আনায়নকারীগণ বলে উঠেছিলেন, আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে? হ্যাঁ আল্লাহর সাহায্য নিকটেই।” সুরা বাকারা:২১৪

একটি ইসলামী আন্দোলন বিজয়ী হবে তখনই যখন আল্লাহর নুসরাহ্ আসবে। আর আল্লাহর নুসরাহ্ আসার আগে আন্দোলনের কর্মীবাহিনীকে যে ধাপগুলো অতিক্রম করতে হবে এ আয়াতের ভাষ্যমতে তা হল, তারা চরম অর্থ-সংকটে পড়বে। সীমাহীন দু:খ-ক্লেশ তাদের জীবন পর্যুদুস্ত করে দিবে। একটা ভীতিকর পরিস্থিতির মোকাবেলা তাদের করতে হবে। এ ধরণের একটা কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হয়ে, দুনিয়া ও দুনিয়ার সকল চিজ-আসবাব থেকে শতভাগ বিমুখ হয়ে এক অদ্বিতীয় শক্তিমান আল্লাহর কাছে নতশীরে সাহায্য ভিক্ষা করতে হবে।

Scroll to Top
Scroll to Top